স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রবন্ধ

জ্ঞান

স্কিন টেস্ট (Skin Allergy Test): কার জন্য উপযুক্ত এবং এটি কী কাজে সাহায্য করে

RAWEERAT SITCHARUNGSI,MD.

স্কিন টেস্ট (Skin Allergy Test): কার জন্য উপযুক্ত এবং এটি কী কাজে সাহায্য করে

স্কিন টেস্ট বা ‘ত্বকের অ্যালার্জি পরীক্ষা’ হলো এমন একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে চিকিৎসকরা নির্ণয় করতে সাহায্য করেন যে শরীর কোন কোন অ্যালার্জেনের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখায়। এর মধ্যে ধুলা, পরাগরেণু, প্রাণীর লোম/খুশকি, খাবার কিংবা কিছু রাসায়নিক পদার্থও থাকতে পারে। স্কিন টেস্টের মাধ্যমে কোন জিনিসে অ্যালার্জি রয়েছে তা জানা যায়, ফলে সেসব ট্রিগার সঠিকভাবে এড়িয়ে চলা এবং বিপজ্জনক অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।


এই নিবন্ধে স্কিন টেস্ট সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে—অ্যালার্জি পরীক্ষার ধাপ থেকে শুরু করে এর উপকারিতা পর্যন্ত—যাতে স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিকভাবে বুঝে যথাযথ যত্ন নেওয়া যায়।


মূল বিষয়গুলো


  • স্কিন টেস্ট হলো অ্যালার্জি শনাক্ত করার একটি পরীক্ষা, যেখানে বিভিন্ন অ্যালার্জেন ত্বকে প্রয়োগ করে দেখা হয় শরীর কোন পদার্থের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখায়।
  • যাদের অ্যালার্জির মতো উপসর্গ রয়েছে, যেমন ত্বকে র‍্যাশ, হাঁচি, নাক বন্ধ হওয়া, চোখ চুলকানো, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, অথবা নির্দিষ্ট খাবার খাওয়া কিংবা পোকামাকড়ের কামড়ের পর তীব্র অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়—তাদের জন্য স্কিন টেস্ট উপযোগী হতে পারে।
  • স্কিন টেস্টের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সাধারণত খুব সামান্য। পরীক্ষার স্থানে চুলকানি, ফোলা বা লালচে ভাব দেখা দিতে পারে, যা সাধারণত ১–২ ঘণ্টার মধ্যে নিজে থেকেই কমে যায়।

স্কিন টেস্ট বা ত্বকের অ্যালার্জি পরীক্ষা কী


স্কিন অ্যালার্জি টেস্ট (Skin Prick Test) হলো এমন একটি পরীক্ষা, যার মাধ্যমে কোন কোন অ্যালার্জেনের প্রতি একজন ব্যক্তির শরীর প্রতিক্রিয়া দেখায় তা নির্ণয় করা হয়।


চিকিৎসক ত্বকের ওপর বিভিন্ন ধরনের অ্যালার্জেনের নির্যাসের ছোট ছোট ফোঁটা দেন। যেমন—ধুলার মাইট, ঘাসের পরাগরেণু, ছত্রাক, বিড়াল, কুকুর, সামুদ্রিক খাবার, গরুর দুধ, ডিম, সয়াবিন, চিনাবাদাম ও গমের আটা ইত্যাদি। এরপর একটি ছোট সূঁচ দিয়ে প্রতিটি স্থানে হালকাভাবে ত্বক ফুটিয়ে দেওয়া হয় এবং ওই স্থানের ত্বকের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হয়।


কোনো নির্দিষ্ট পদার্থের প্রতি অ্যালার্জি থাকলে পরীক্ষার স্থানে ফোলা, লালচে ভাব, চুলকানি বা র‍্যাশের মতো অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।


কারা স্কিন টেস্ট করাতে পারেন


নিচের ধরনের উপসর্গ থাকা ব্যক্তিদের জন্য স্কিন টেস্ট উপযোগী হতে পারে:


১. শ্বাসতন্ত্রের অ্যালার্জি (Respiratory Allergies)


যেমন:


  • নাক বন্ধ হওয়া
  • নাক দিয়ে পানি পড়া
  • হাঁচি
  • কাশি
  • বারবার সর্দি-কাশির মতো উপসর্গ হওয়া

এছাড়াও যাদের পরিবারে অ্যালার্জির ইতিহাস রয়েছে, শৈশবকাল থেকেই অ্যালার্জি রয়েছে, অথবা যাদের অ্যাজমা বা অ্যালার্জিক রাইনাইটিস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।


২. ত্বকের অ্যালার্জি (Skin Allergies)


যেমন:


  • চুলকানিযুক্ত র‍্যাশ
  • আর্টিকারিয়া বা চাকা ওঠা
  • ত্বকের অ্যালার্জি
  • একজিমা (Eczema)

৩. চোখের অ্যালার্জি (Eye Allergies)


যেমন:


  • চোখ চুলকানো
  • চোখ ফুলে যাওয়া
  • চোখ দিয়ে পানি পড়া
  • কনজাংটিভাইটিস

৪. খাবারে অ্যালার্জি (Food Allergy)


নির্দিষ্ট খাবার খাওয়ার পর যদি দেখা দেয়:


  • মুখের ভেতর চুলকানি
  • জিহ্বা ফুলে যাওয়া
  • ত্বকে র‍্যাশ

৫. ওষুধ বা পোকামাকড়ের কামড়ে অ্যালার্জি


পোকামাকড়ের কামড়ের পর যদি ফোলা, লালচে ভাব বা গুরুতর অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া (Anaphylaxis) দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যালার্জি পরীক্ষা করা যেতে পারে।


৬. অ্যালার্জির ট্রিগার জানতে চান এমন ব্যক্তি


কোন কোন উপাদান অ্যালার্জির কারণ হচ্ছে তা জানতে পারলে সেগুলো এড়িয়ে চলা এবং চিকিৎসার পরিকল্পনা আরও সুনির্দিষ্টভাবে করা সম্ভব।


স্কিন টেস্টের উপকারিতা কী


স্কিন অ্যালার্জি টেস্টের বিভিন্ন উপকারিতা রয়েছে:


  • অ্যালার্জির উপসর্গের কারণ এবং কোন অ্যালার্জেনের কারণে তা হচ্ছে তা শনাক্ত করতে সাহায্য করে, ফলে চিকিৎসক অ্যালার্জিজনিত রোগ আরও নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করতে পারেন।
  • অ্যালার্জির কারণ জানা গেলে কোন কোন জিনিস এড়িয়ে চলতে হবে তা বোঝা যায়। যেমন—কুকুর বা বিড়াল, সামুদ্রিক খাবার, নির্দিষ্ট বাদাম, ডিম, দুধ ইত্যাদি।
  • গুরুতর অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে, যা কিছু ক্ষেত্রে জীবন-হুমকিস্বরূপ হতে পারে।
  • প্রয়োজনে চিকিৎসক উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা করতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে অ্যালার্জেন ইমিউনোথেরাপি (Allergen Immunotherapy) দেওয়া হতে পারে, যেমন ত্বকের নিচে ইনজেকশনের মাধ্যমে অথবা জিহ্বার নিচে দেওয়া ইমিউনোথেরাপি।

স্কিন টেস্টের আগে প্রস্তুতি


স্কিন টেস্টের ফলাফল যতটা সম্ভব নির্ভুল রাখতে সাধারণত নিচের বিষয়গুলো অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়:


  • অ্যান্টিহিস্টামিন (Antihistamines)—যেমন Cetirizine বা Desloratadine—পরীক্ষার অন্তত ৭ দিন আগে বন্ধ করার প্রয়োজন হতে পারে। এসব ওষুধ ত্বকের প্রতিক্রিয়া কমিয়ে দিতে পারে এবং পরীক্ষার ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে কোনো ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ না করে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
  • ইনজেকশন, ত্বকে লাগানোর ওষুধ বা মুখে খাওয়ার স্টেরয়েড ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণত ১–৩ সপ্তাহের ব্যবধান প্রয়োজন হতে পারে। স্টেরয়েড ব্যবহার করা জরুরি হলে আগে থেকেই চিকিৎসককে জানাতে হবে।
  • ঘুমের ওষুধ, সেডেটিভ, মাথা ঘোরা বা মোশন সিকনেসের কিছু ওষুধও ১–৩ সপ্তাহ আগে বন্ধ করার প্রয়োজন হতে পারে, কারণ এগুলো পরীক্ষার ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
  • আগে কোনো ওষুধে অ্যালার্জি হয়ে থাকলে এবং কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগের জন্য নিয়মিত ওষুধ সেবন করলে নিরাপত্তা ও পরীক্ষার নির্ভুলতার জন্য চিকিৎসককে অবশ্যই জানাতে হবে।
  • পরীক্ষার দিন ছোট হাতার পোশাক পরা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া ভালো। পানি বা খাবার গ্রহণ বন্ধ রাখার প্রয়োজন নেই, যদি না চিকিৎসক অন্য কোনো নির্দেশনা দেন।

স্কিন টেস্ট কীভাবে করা হয়


স্কিন টেস্ট সাধারণত বেশি সময় নেয় না এবং খুব বেশি ব্যথাও হয় না। সাধারণ ধাপগুলো হলো:


  • স্বাস্থ্যকর্মী পরীক্ষার স্থান পরিষ্কার করবেন। সাধারণত বাহুর নিচের অংশ বা পিঠের ওপরের অংশে পরীক্ষা করা হয়।
  • কলম দিয়ে পরীক্ষার স্থানগুলো চিহ্নিত করা হবে।
  • বিভিন্ন অ্যালার্জেনের নির্যাস ত্বকের ওপর ফোঁটা আকারে দেওয়া হবে।
  • চিকিৎসক ছোট একটি সূঁচ দিয়ে প্রতিটি ফোঁটার স্থানে ত্বক হালকাভাবে ফুটিয়ে দেবেন। এতে সাধারণত ছোট পিঁপড়ার কামড়ের মতো সামান্য অনুভূতি হতে পারে।
  • প্রায় ১৫–২০ মিনিট অপেক্ষা করে ত্বকের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হবে।
  • পরীক্ষার স্থানে ফোলা, লালচে ভাব বা চুলকানি হয়েছে কি না তা চিকিৎসক নথিভুক্ত করবেন।
  • এরপর ত্বক আবার অ্যান্টিসেপটিক অ্যালকোহল দিয়ে পরিষ্কার করা হবে।
  • চুলকানি, ফোলা ও লালচে ভাব কমানোর জন্য প্রয়োজনে ওষুধ দেওয়া হতে পারে। পরীক্ষার কারণে তৈরি হওয়া ফোলা অংশ সাধারণত ১–২ ঘণ্টার মধ্যে নিজে থেকেই কমে যায়।

স্কিন টেস্টের পর সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া


ทดสอบภูมิแพ้

সাধারণভাবে স্কিন টেস্ট একটি নিরাপদ পরীক্ষা এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুব কম। কারণ পরীক্ষায় ব্যবহৃত অ্যালার্জেনের পরিমাণ খুবই অল্প। তবে পরীক্ষার পর কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে।


  • চুলকানি ও ফোলা
    • পরীক্ষার স্থানে চুলকানি, ফোলা বা লালচে ভাব হতে পারে, যা সাধারণত কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চলে যায়। উপসর্গ কমানোর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ত্বকে লাগানোর বা মুখে খাওয়ার অ্যান্টিহিস্টামিন ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • গুরুতর অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া
    • অত্যন্ত গুরুতর অ্যালার্জির ক্ষেত্রে (Anaphylaxis) সারা শরীরে র‍্যাশ, বুকে চাপ বা শ্বাসকষ্ট, রক্তচাপ কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। হাসপাতালে স্কিন টেস্ট করা হলে চিকিৎসক রোগীকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসা প্রদান করেন। তবে গুরুতর অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

আপনি কোন জিনিসে অ্যালার্জিক তা জেনে তা এড়িয়ে চলুন


স্কিন টেস্ট এমন একটি পদ্ধতি, যা শরীর কোন কোন অ্যালার্জেনের প্রতি অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখায় তা শনাক্ত করতে সাহায্য করে। পরীক্ষাটি দ্রুত, জটিল নয় এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও খুব কম। পরীক্ষার ফলাফল জানার পর রোগী অ্যালার্জির কারণ হওয়া উপাদানগুলো এড়িয়ে চলতে পারেন। এর ফলে চোখ চুলকানো, নাক বন্ধ হওয়া, নাক দিয়ে পানি পড়া ইত্যাদি অ্যালার্জির উপসর্গ বারবার হওয়ার সম্ভাবনা কমতে পারে। একই সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনে অ্যালার্জির কারণে সৃষ্ট সমস্যা কমানো এবং গুরুতর, এমনকি জীবন-হুমকিস্বরূপ অ্যালার্জিক অবস্থার ঝুঁকি কমাতেও সাহায্য করতে পারে।


আপনার যদি অ্যালার্জিজনিত রোগের সন্দেহ থাকে—যেমন চুলকানিযুক্ত র‍্যাশ, আর্টিকারিয়া, অ্যাজমা বা খাদ্য অ্যালার্জি—তাহলে Praram 9 Hospital-এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে স্কিন টেস্টের সেবা নেওয়া যেতে পারে। পরীক্ষার প্রতিটি ধাপে মানসম্মত সরঞ্জাম ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে।


আরও তথ্যের জন্য



অ্যালার্জি সম্পর্কে প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলি


১. অ্যালার্জির কারণে কি সত্যিই চোখের নিচে কালচে দাগ হতে পারে?


অ্যালার্জির কারণে চোখের নিচে কালচে দাগ হতে পারে, বিশেষ করে অ্যালার্জিক রাইনাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে। নাকের ভেতরে প্রদাহ ও ফোলাভাব রক্ত সঞ্চালনে প্রভাব ফেলতে পারে, ফলে চোখের নিচে রক্ত জমে গিয়ে ওই অংশের ত্বক স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি কালচে দেখাতে পারে।


২. অ্যালার্জিকে কি দীর্ঘস্থায়ী রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়?


অ্যালার্জিকে দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এর উপসর্গ হালকা থেকে গুরুতর হতে পারে, বিশেষ করে যখন উপসর্গ দীর্ঘদিন থাকে বা ঘন ঘন ফিরে আসে। ধুলাবালি, পরাগরেণু বা নির্দিষ্ট খাবারের মতো অ্যালার্জেনের সংস্পর্শে এলে উপসর্গ প্রায়ই পুনরায় দেখা দিতে পারে।


তথ্যসূত্র


Mayo Clinic Staff. (2024, March 26). Allergy skin tests. Mayo Clinic. https://www.mayoclinic.org/tests-procedures/allergy-tests/about/pac-20392895


Morris, S.Y. (2018, June 6). What Is a Skin Prick Test?. Healthline. https://www.healthline.com/health/allergies/skin-prick-test-accuracy


Allergy Skin Test. (2023, April 4). Cleveland Clinic. https://my.clevelandclinic.org/health/diagnostics/24912-allergy-skin-test


সম্পর্কিত প্রবন্ধ (0)

সব দেখুন

Copyright © 2024 All Rights Reserved | Praram 9 Hospital